চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও এলাকার ঐতিহাসিক বুদবুদি ছড়া আবারও আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, ব্রিটিশ আমলে আবিষ্কৃত এ সম্ভাবনাময় গ্যাসক্ষেত্র থেকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অনবরত গ্যাস নির্গত হলেও আজও বাণিজ্যিকভাবে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে দেশের চলমান জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে এলাকাটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
স্থানীয় ইতিহাস ও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে তৎকালীন বার্মা অয়েল কোম্পানি (বর্তমান শেল/বিদেশি অংশীদার কোম্পানির পূর্বসূরি) এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননের কাজ পরিচালনা করে। ওই সময় পরীক্ষামূলকভাবে একটি কূপ খনন করা হলেও পরবর্তীতে তা পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে নেওয়া হয়নি। খননকাজ শেষ হওয়ার পর কূপের মুখ সিসা ঢালাই ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে প্রবীণদের বর্ণনায় জানা যায়। তবে কূপ বন্ধ থাকার পরও আশপাশের ছড়া, জলাশয় ও মাটির বিভিন্ন স্থান দিয়ে বুদবুদ আকারে গ্যাস বের হতে থাকে। এ কারণেই এলাকাটি ধীরে ধীরে ‘বুদবুদি ছড়া’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ছড়ার বিভিন্ন অংশে পানির নিচ থেকে নিয়মিত বুদবুদ উঠছে, যা স্থানীয়দের মতে দাহ্য গ্যাসের উপস্থিতির স্পষ্ট ইঙ্গিত। অনেক সময় দেশলাই বা আগুনের শিখা কাছে নিলে অল্প সময়ের জন্য দাহ্য প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে বলে এলাকাবাসীর দাবি। তবে এসব বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক যাচাই দীর্ঘদিন ধরে হয়নি।
স্থানীয় প্রবীণ আমির হামজা জানান, একসময় বিভিন্ন সময়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে জরিপ ও অনুসন্ধানের কথা শোনা গেলেও তা স্থায়ী বা ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগে রূপ নেয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানি (বাপেক্স) বা পেট্রোবাংলার নতুন কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই বলে অভিযোগ তাদের। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, সম্ভাবনাময় এই গ্যাস উৎস দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় একদিকে যেমন জাতীয় সম্পদের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে পুনরায় গভীর অনুসন্ধান চালানো হলে এখানে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যমান গ্যাস সংকটের প্রেক্ষাপটে পুরোনো ও পরিত্যক্ত গ্যাসক্ষেত্রগুলোকে নতুন করে মূল্যায়ন করা জরুরি। তাদের মতে, 3D সিসমিক সার্ভে, আধুনিক ড্রিলিং প্রযুক্তি এবং ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বুদবুদি ছড়ার প্রকৃত মজুদ ও উত্তোলন সম্ভাবনা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশগত ঝুঁকি ও নিরাপত্তা বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্থানীয় বাসিন্দারা বুদবুদি ছড়ায় দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ভূতাত্ত্বিক জরিপ, আধুনিক প্রযুক্তিতে অনুসন্ধান এবং সম্ভাব্য গ্যাস উত্তোলনের বিষয়ে সরকারের কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এই এলাকা দেশের জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হতে পারে।
ছবির ক্যাপশনঃপরিত্যক্ত কূপেও গ্যাসের প্রবাহ অব্যাহত, বুদবুদি ছড়া ঘিরে নতুন অনুসন্ধান দাবি